৮৪. নৃশংস গুলির বৃষ্টি
অস্বাভাবিক আত্মার অধিকারী মানুষরা যেন প্রতিভার মধ্যেও সেরা প্রতিভা। এদের আত্মা দানবদের দৃষ্টিতে অতুলনীয় ভোজ্য, যার স্বাদে তারা লোভে গলে যায়, যেকোনো উপায়ে এ ধরনের আত্মা পাওয়ার জন্য ব্যাকুল থাকে। সাধারণত, এমন আত্মার অধিকারী মানুষরা খুব কমই আঠারো বছর বয়স পর্যন্ত বেঁচে থাকে।
কারণ, অসংখ্য দানব এই আত্মার জন্য হাহাকার করে। তারা এমনকি এক ঢোকেই গিলে ফেলতে চায়। তারা নানা ছলনায় এই মানুষটিকে প্রলুব্ধ করে, যতক্ষণ না সে নিজ আত্মা বিক্রি করে দেয়।
যখন ইয়ান শাওবেই এই মানুষের প্রতিভার কথা শুনল, তখন সে নিজের অজান্তেই কিছুটা ঈর্ষান্বিত এবং হতাশ বোধ করল। কারণ, বেটির প্রতিভা এতটাই অসাধারণ ছিল যে, ইয়ান শাওবেইয়ের দশগুণ, এমনকি কয়েকগুণ বেশি। ইয়ান শাওবেই কয়েক সপ্তাহ সাধনা করেও যা অর্জন করতে পারত, বেটি একদিনেই তা পারত। তাদের পার্থক্য একদিন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাবে যা কল্পনাতীত, ইয়ান শাওবেই বহু পিছিয়ে পড়ে যাবে।
রহস্যময় কণ্ঠটি গম্ভীরভাবে বলল, ‘‘এমন কেউ যদি নিজের শিষ্য হয়, তাহলে নিঃসন্দেহে তার কাছে সব কিছু উজাড় করে শেখাতে হয়, এতে বেশি সময় লাগবে না, সে শিষ্যই গুরুকে ছাড়িয়ে যাবে। কিন্তু যদি সে শত্রু হয়, তাহলে আগেভাগেই তাকে নিশ্চিহ্ন করতে হবে, যাতে একদিন সে তোমাকে চুরমার করে দিতে না পারে। আর যদি সে অধীনস্ত হয়, তাহলে তাকে চেপে রাখতে হবে।’’
‘‘চেপে রাখতে হবে?’’
‘‘ঠিক তাই, একদিন বেটি শক্তিশালী হয়ে উঠলে, সে এমনকি তোমার আরোপিত নিষেধাজ্ঞা ছিঁড়ে ফেলতে পারে, তোমাকে পরাস্ত করতে পারে। তাই তাকে দমন করতে হবে, কখনোই তার অগ্রগতি তোমাকে ছাড়িয়ে যেতে দেবে না, তাকে শক্ত হাতে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।’’
রহস্যময় কণ্ঠটি বলল, ‘‘কোনোভাবেই তাকে কোনো মানসিক সাধনার পদ্ধতি শেখানো যাবে না। তাকে নিজের মতো করে পথ খুঁজে নিতে দাও, কারণ সঠিক সাধনার পথ ছাড়া শুধুমাত্র নিজের অজ্ঞতায় তোমাকে ছাড়িয়ে যাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়।’’
প্রাগৈতিহাসিক যুগের সবচেয়ে মেধাবী মানুষও আধুনিক যুগের স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রধারীর চেয়ে শ্রেষ্ঠ হতে পারে না।
মানসিক সাধনার পদ্ধতি হাজার বছরের সংরক্ষণে গড়ে উঠেছে, একা একজন মানুষের পক্ষে তা অতিক্রম করা অসম্ভব। একজন নিরক্ষর লোক, যার কেউ লেখা পড়া শেখায়নি, সে নিজের চেষ্টা দিয়ে ডক্টরেট করবে—এ কল্পনাও করা যায় না। লেখা পড়া জানে না, যতই বুদ্ধিমান হোক, কিভাবে সে ডক্টরেট করবে?
‘‘বুঝেছি,’’ ইয়ান শাওবেই কোনো আপত্তি করল না।
বেটির আত্মার শক্তি মুক্তি পেতেই, সে নিজেকে এক আশ্চর্য পরিবর্তনের মধ্যে অনুভব করল, সে ডান হাত বাড়াতেই দেখল, হাতটা হাওয়ায় ঢুকে অর্ধেকটা অদৃশ্য হয়ে গেছে।
ইয়ান শাওবেই বিস্মিত হয়ে মনোযোগ দিল, দেখল, অদৃশ্য অর্ধেক হাতটা তার পেছনে দেখা যাচ্ছে।
সে নিজের শরীর সরাতেই, বেটি তার অর্ধেক হাত দেখতে পেল।
‘‘আহ! আহ!’’
সে আতঙ্কে চিৎকার করল, তাড়াতাড়ি হাতটা ফিরিয়ে নিল, ‘‘কি, কি হচ্ছে? আমার হাত হঠাৎ এখানে কেন এল? কেন?’’
ইয়ান শাওবেই তাকে শান্ত করল এবং তার জাগ্রত শক্তি সম্পর্কে জানাল।
‘‘স্থানকে স্বাধীনভাবে নিয়ন্ত্রণ করা?’’ বেটি বিস্ময়ে হতবাক, ভাবতেই পারে নি সে এমন শক্তির অধিকারী হয়েছে, এটা একেবারেই অবিশ্বাস্য। তার ভুরু কুঁচকে গেল, বিস্ময় প্রকাশ পেল।
ইয়ান শাওবেই বলল, ‘‘এই শক্তি আমারও অপরিচিত, তোমাকেই একা একা খুঁজে নিতে হবে।’’
‘‘বুঝেছি।’’
বেটি নিজের বুক চাপড়াল, দ্রুত ধুকপুক করতে থাকা হৃদয় ধীরে ধীরে শান্ত হলো, কিন্তু অসাধারণ শক্তি পাওয়ার কথা মনে হতেই উত্তেজনায় গাল লাল হয়ে উঠল।
সে আবারো ডান হাত বাড়াল, অর্ধেক হাত হাওয়ায় ডুবে গেল, অদৃশ্য হয়ে গেল।
তারপর, বেটির হাতটা ডেস্কের সামনে হাজির হল, ডেস্ক থেকে একটি ছবি তুলে নিল, হাত ফিরিয়ে আনতেই ছবিটি বিনা ক্ষতি তার হাতে চলে এল।
যেখানে সে দাঁড়িয়ে ছিল, ডেস্ক থেকে তিন মিটার দূরে।
‘‘ওহ ঈশ্বর, এটা তো অবিশ্বাস্য, একেবারে অবিশ্বাস্য!’’ সে অবিরাম বিড়বিড় করল।
ইয়ান শাওবেই দেওয়ালে ঘড়ির দিকে তাকাল, দেখল তখন দুপুর দুইটা তিপ্পান্ন মিনিট, সাক্ষাৎকার চলেছে আধা ঘণ্টার বেশি, মনে হলো শেষ হতে চলেছে।
ইয়ান শাওবেই বেটিকে নিজের শক্তি অনুশীলনের জন্য একা রেখে, ঘর থেকে বেরিয়ে নিচে এল।
এ সময়, অকটাভিয়া এবং গ্যাং নেতা, বেটির বাবা স্কারলেট একসঙ্গে উঠে দাঁড়ালেন, দরজার দিকে এগোতে লাগলেন, কথা বলতে বলতে কখনো হাসলেন, মনে হলো আলোচনাটা খুব ইতিবাচক।
ইয়ান শাওবেই এগিয়ে গিয়ে অকটাভিয়ার পাশে দাঁড়াল, কেউ তার উপস্থিতি নিয়ে মাথা ঘামাল না, যেন সে সবসময় এখানেই ছিল।
‘‘বিদায় বলার সময় হয়েছে, স্কারলেট সাহেব, আপনার সাক্ষাৎকার নেওয়ার সুযোগ পেয়ে আমি কৃতজ্ঞ।’’
‘‘হা হা, আপনার মতো সম্মানিত সাংবাদিকের সাক্ষাৎকারে সম্মত হওয়া আমার জন্য সম্মানের। যখনই চান, আমি কখনোই আপনার অনুরোধ ফিরিয়ে দেব না। বলা যায়, আমাদের বেটি আপনার সহকর্মী।’’
স্কারলেটের মুখ একেবারেই সাধারণ, গ্যাং নেতার কোনো কঠোরতা নেই, কিন্তু তার মধ্যে এমন নিরাবেগ শীতলতা ছিল, যা হাসলেও লুকাতে পারে না।
‘‘আজ বেটি মিস করেছি, একটু দুঃখ হচ্ছে। তবে আপনি যেমন বললেন, আমরা সহকর্মী, প্রতিদিনই দেখা হবে।’’
‘‘ঠিক তাই, অকটাভিয়া, আমার সেই একগুঁয়ে মেয়েটির খেয়াল রাখবেন।’’
‘‘অবশ্যই।’’
তিনি সময়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘‘সময় হয়ে গেছে, এখানেই বিদায়।’’
‘‘ঠিক আছে, তুমি, অকটাভিয়ার সঙ্গে যাও।’’
গ্যাং নেতা এক দেহরক্ষীকে ইঙ্গিত করল, সে অকটাভিয়ার নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
দেহরক্ষী কোনো কথা না বলে এগিয়ে এল, অকটাভিয়া বারবার অস্বীকার করলেও, স্কারলেটের অনুরোধে শেষ পর্যন্ত রাজি হতে হলো।
সবাই বাড়ির প্রধান ফটকের দিকে এগিয়ে গেল।
এ সময় ইয়ান শাওবেইর মনোসংযোগ হঠাৎ চঞ্চল হল, সে শরীরে বিদ্যুতের মতো অকটাভিয়ার দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল, ‘‘সাবধান!’’
‘‘কি... আহ!’’
অকটাভিয়া কিছু বুঝে ওঠার আগেই ইয়ান শাওবেই তাকে মাটিতে ফেলে দিল, সে কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই, দেহরক্ষীর মাথা হঠাৎ বিস্ফোরণে চূর্ণ হয়ে গেল।
ঠিক যেন শত মিটার উঁচু থেকে পড়ে যাওয়া তরমুজ।
রক্ত আর মগজ মিশ্রিত তরল চারদিকে ঝর্ণার মতো ছিটিয়ে পড়ল, ইয়ান শাওবেই এক হাতে মাটি চেপে অকটাভিয়াকে বুকে ধরে, মাটির ওপর গড়িয়ে এক ঝর্ণার মূর্তির আড়ালে চলে গেল।
পরক্ষণেই, ঝড়ের মতো গুলি বর্ষণ শুরু হল।
তীব্র গুলির শব্দে আকাশ-বাতাস কেঁপে উঠল।
হিংস্র গুলির ধারা আকাশ ও জমি ঢেকে দিল, ঝর্ণার দেবদূতের মূর্তিটা মুহূর্তেই গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে, কোনো সময়ে ভেঙে পড়তে পারে।
ভাঙা ঝর্ণার জল আকাশ ছুঁয়ে উঠে, ফের নেমে এল আবছা বৃষ্টির মতো।
অকটাভিয়া আতঙ্কিত, কিছুই বুঝতে পারল না।
ইয়ান শাওবেই সব বুঝল, তার মনোশক্তিতে সে দেখল, বিশেরও বেশি সশস্ত্র, মেশিনগানধারী, বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট, গ্যাসমাস্ক পরিহিত ডাকাত ভিলায় ঢুকে পড়েছে।
‘‘টার্গেট স্কারলেট, বাকিদের মেরে ফেললে কিছু যায় আসে না।’’
গুরুত্বপূর্ণ একজন ডাকাত আদেশ দিল, ইয়ান শাওবেই দেখল, অকটাভিয়ার কপালে দুর্ভাগ্যের অভিশাপ বারবার জ্বলে উঠছে, নিশ্চিত সে আবারও দুর্ভাগ্যের কবলে পড়েছে।
‘‘কিছু বলো না, নড়বে না, কারো টার্গেট স্কারলেট, আমরা কেবল বিপদে পড়েছি।’’
ইয়ান শাওবেই তাকে সান্ত্বনা দিল।
‘‘ধন্যবাদ।’’
অকটাভিয়া নিচু গলায় বলল, কিন্তু তার দেহ প্রবলভাবে কাঁপছিল, সে ছিল অভিজাত পরিবারের, একজন নাইটের মেয়ে, কিন্তু তার মধ্যে নাইটের সাহসিকতা ছিল না, বরং সাধারণ নারীর মতোই বিপদের মুখে কাঁপছিল।
‘‘আমার একটা তলোয়ার চাই।’’
‘‘কি?’’
অকটাভিয়া ইয়ান শাওবেইর চোখে চোখ রেখে বলল, ‘‘একটা তলোয়ার চাই, যেমনই হোক, কাঠের লাঠি হলেও চলবে।’’
‘‘তুমি কি করতে চাও?’’ ইয়ান শাওবেই জিজ্ঞেস করল।
‘‘যুদ্ধ করব।’’
সে ভয়ে কাঁপছিল, কিন্তু মুখে যুদ্ধের কথা বলল।
‘‘কি, তুমি যুদ্ধ করবে?’’
ইয়ান শাওবেই হাসল, মনে মনে বলল, আমি তোমাকে না ধরে রাখলে তুমি এতক্ষণে পড়ে যেতে, উঠে দাঁড়ানোর শক্তি নেই, যুদ্ধ তো দূরের কথা।
এদিকে গুলি ঝড়ের মতো আসছিল, গুলির বৃষ্টি চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছিল।
তারা ঝর্ণার পেছনে আশ্রয় নিয়েছিল, গুলি তাদের পাশ দিয়ে ছুটে গিয়ে সামনে বাড়ির দেয়ালে আঘাত করছিল।
দেয়ালে অসংখ্য গুলির ছিদ্র, বড় বড় পাথর পড়ে যাচ্ছিল, কাচ ভেঙে চূর্ণ হচ্ছিল।
কিন্তু ডাকাতরা একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ল না, বরং গুলি চালিয়ে বাড়িটাকে ঝাঁঝরা করতে চাইল, যেন বাড়ির ফাঁদ আর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে সতর্ক।
ইয়ান শাওবেই বুঝে গেল।
এটা গ্যাং নেতার বাড়ি, প্রতিরক্ষা ছাড়া কিভাবে হয়?
শীঘ্রই, ইয়ান শাওবেই দেখল নেতার পাল্টা আক্রমণ।
গিয়ারের শব্দে ঝর্ণার ভেতর থেকে একের পর এক মেশিনগান উঠে এলো, গুলি চালাতে শুরু করল।
গুলির বৃষ্টিতে গুলি প্রতিহত।
ডাকাতরা চটজলদি আশ্রয়ে চলে গেল।
এতেই শেষ নয়, ফুটপাতের দু’পাশের ঝোপও ফেটে গিয়ে আরও মেশিনগান উঠল, স্বয়ংক্রিয়ভাবে গুলি ছুড়ল, চারদিকে গুলির বৃষ্টি।
ইয়ান শাওবেই আচমকা অকটাভিয়ার মাথা চেপে ধরল, তার মুখ নিজের উরুর মাঝে চেপে ধরল।
একটি ছুটে আসা গুলি মাটিতে লেগে, সামান্য এদিক-ওদিক হলেই অকটাভিয়ার মাথা চূর্ণ হয়ে যেত।
অকটাভিয়া ভয়ে তীব্র শ্বাস নিল।
‘‘ধন্য... ধন্যবাদ...’’
‘‘কিছু না।’’