অধ্যায় ১২০: মাছ ধরা দিয়ে জীবিকা অর্জন
কিরুনোর ফলশক্তির ছোট পর্বটি শেষ হওয়ার পর, লিটল গার্ডেন দ্বীপের দৈত্যাকার ও ক্ষুদ্রকায় মানুষগুলো তাদের প্রতিদিনের চ্যালেঞ্জ, শরীরচর্চা আর আড্ডায় মেতে রইল। গত কয়েক মাস ধরে কার্ল তার সমস্ত শক্তি অনুশীলনে ঢেলে দিয়েছে, অন্য কোথাও গিয়ে ঝামেলা পাকানোর কোনো ইচ্ছা তার ছিল না। লিটল গার্ডেন যেন তার কাছে এক আরামদায়ক ‘ইউরোপিয়া’ বা স্বর্গরাজ্য হয়ে উঠেছিল।
সম্ভবত বিস্ট পাইরেটসের সাথে যুদ্ধের কারণে, শার্লট ফ্যামিলি কার্নিভাল সিটির সেই সামান্য ঘটনার জের ধরে রেলিগ ট্রেডিং কোম্পানির কোনো ক্ষতি করার সাহস দেখায়নি। বরং গত কয়েক মাসের নিউ ওয়ার্ল্ডের শিরোনাম জুড়ে ছিল বিস্ট পাইরেটস ও বিগ মম পাইরেটসের নিজেদের মধ্যে ভূখণ্ড দখলের লড়াই।
আজ কার্ল ফ্রস্ট অফ সায়ারের হিমশীতল শক্তি ব্যবহার করে লিটল গার্ডেনের পাশের সমুদ্রে বিশাল এক বরফের খণ্ড তৈরি করেছিল। সে দ্বীপের ওপর দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল দ্বীপভোজী দানবটির আগমনের জন্য। কয়েক মাসের প্রচেষ্টায় সে ‘এলবাফের গান: হাকোকু’ বা ‘যুগান্তকারী আক্রমণ’ রপ্ত করে ফেলেছে, যদিও তার শক্তির তীব্রতা ব্রোগি ও ডোরির যৌথ আক্রমণের ধারেকাছেও পৌঁছায়নি।
এই ‘হাকোকু’ কোনো সাধারণ তলোয়ার চালনা বা বন্দুকের কৌশল নয়; এটি শরীরের ভেতরের শক্তিকে অস্ত্রের ডগায় পুঞ্জীভূত করে এক প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটানোর বিদ্যা। এর চূড়ান্ত প্রয়োগে হক আইয়ের তলোয়ারের ঝাপটা বা কার্পের ঘুষির মতোই এক আঘাতে বিশাল পাহাড় গুঁড়িয়ে দেওয়া সম্ভব, আর এর আওতাও অনেক বেশি। ‘ডেথ টম্বস্টোন’-এর পর এটিই কার্লের দ্বিতীয় শক্তিশালী দীর্ঘপাল্লার মারণাস্ত্র।
সমুদ্রের ঢেউ অস্বাভাবিক হয়ে উঠল। চোখ বন্ধ করে থাকা কার্ল চোখ খুলল, সে জানে সেই দানবটি আসছে।
হঠাৎ করেই শান্ত সমুদ্র উত্তাল হয়ে উঠল। যেন কোনো টাইফুনের প্রভাবে সুনামি সৃষ্টি হয়েছে, বিশাল এক জলের প্রাচীর সমুদ্র থেকে উঠে এসে কার্লের অবস্থান লক্ষ্য করে ঝাঁপিয়ে পড়ল। কার্লের পায়ের নিচের বরফখন্ডটি কাঁচের মতো ভেঙে চুরমার হয়ে গেল এবং জলের নিচে তলিয়ে গেল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই সুনামি শান্ত হয়ে গেল, আবার ফিরে এল উজ্জ্বল রোদ। সমুদ্রের ওপর ভাসমান বরফের টুকরোগুলোর মাঝে বিশাল এক গোল্ডফিশের ভয়ংকর অবয়ব ভেসে উঠল। মাছটি যেন থমকে দাঁড়িয়ে কিছু একটা ভাবছিল। তার মনে হচ্ছিল, একটু আগেই এখানে একটা রঙিন জ্বলজ্বলে দ্বীপ ছিল, কিন্তু এখন সেটা কোথায়? জলে ভাসমান এই সাদা টুকরোগুলো কী? এগুলো কি খাওয়া যায়?
কার্ল ততক্ষণে ‘গেপ্পো’ বা আকাশ চলার কৌশলে শূন্যে ভেসে উঠেছে। উপর থেকে সে পুরো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিল। দ্বীপভোজী এই দানবটি নিঃসন্দেহে বিশাল, অনেকটা ল্যাবুনের মতো, কিন্তু সমুদ্রের অন্যান্য বিশাল দানবদের তুলনায় এটা খুব একটা বড় নয়। সমুদ্রের দানবদের আকার নিয়ে কোনো নিয়ম নেই; কোনোটা এত বড় যে নোহা আর্ক টেনে নিতে পারে, আবার কোনোটা সাধারণ হাঙ্গরের চেয়ে একটু বড়।
মনে মনে একটু অবাক হয়ে কার্ল তার তলোয়ার ‘দানহুন’ বা ‘সোল কাটার’-এর ওপর আরমামেন্ট হ্যাকি প্রয়োগ করল। হাকোকু ব্যবহারের জন্য প্রচুর শক্তির প্রয়োজন, আরমামেন্ট হ্যাকি ছাড়া তলোয়ারটি এই প্রচণ্ড চাপের ধকল সইতে পারবে না।
নিজের প্রিয় ‘ঝলমলে দ্বীপ’ হারিয়ে দানবটি বাচ্চার মতো সমুদ্রের জলে আছাড়পিছাড় করতে লাগল। তার বিশাল শরীরের নড়াচড়ায় সমুদ্রে এক বিশাল ঘূর্ণি তৈরি হলো, যা থেকে সৃষ্টি হওয়া ঢেউগুলো আগের চেয়েও বড়। সমুদ্রের গর্জনে চারপাশ কেঁপে উঠল। কিন্তু দানবটি জানত না যে তার মাথার ওপরে এক মশা (কার্ল) তার ওপর এমন এক আক্রমণ করতে যাচ্ছে যা সে আগে কখনো অনুভব করেনি।
‘এলবাফের গান: হাকোকু!’
কার্লের গর্জনের সাথে সাথে তার শরীরের শক্তি দানহুনের ফলায় গিয়ে জমা হলো। সে ওপর থেকে নিচে তলোয়ার চালিয়ে দিল। এক অদৃশ্য শক্তির তরঙ্গ বিস্ফোরিত হলো, যার তীব্রতায় বাতাস ও আলো বেঁকে গেল। হাকোকুর সেই শকওয়েভ যেন স্বর্গ থেকে নেমে আসা কোনো বিচারকের দণ্ড, যা সমুদ্রের এই দানবকে লক্ষ্য করে ছুটে গেল।
দানবটি তার মাথার ওপর বিপদ অনুভব করল, কিন্তু শব্দের চেয়েও দ্রুতগতির সেই শকওয়েভ তার বিশাল শরীরে আঘাত হানল। এক বিকট শব্দে দানবটির শরীরে বিশাল এক গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হলো। যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে দানবটি দ্রুত জলের গভীরে হারিয়ে গেল।
‘তাকে কি মারতে পারলাম না?’
নিজের সর্বোচ্চ শক্তির প্রয়োগে ফলাফল দেখে কার্ল পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারল না। সে চাইলে আরও কয়েকবার হাকোকু বা ঘোস্ট স্লাইস দিয়ে দানবটিকে শেষ করে দিতে পারত। কিন্তু তাতে কার্লের কোনো তৃপ্তি নেই। সে চায় এক আঘাতেই দানবটিকে দ্বিখণ্ডিত করে ফেলতে। যদি সে তা করতে পারে, তবেই সে তার শক্তির নতুন স্তরে পৌঁছাতে পারবে। যদিও বর্তমান শক্তিই তার কম নয়, তবুও সে ধৈর্য ধরে এগোতে চায়।
কার্ল বিড়বিড় করে নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে গেপ্পোর সাহায্যে লিটল গার্ডেনের দিকে উড়তে শুরু করল। ঠিক সেই সময়েই লিটল গার্ডেনের অদূরে এক জলদস্যু জাহাজ ধীরগতিতে এগিয়ে আসছিল। তাদের পতাকায় হাড়ের বদলে দুটি লাল হাতলওয়ালা তলোয়ারের চিহ্ন ছিল, আর খুলির বাঁ চোখে ছিল তিনটি লাল দাগ।
‘বস, ওই দেখুন আকাশে কেউ উড়ছে!’ এক ফায়ারমিলার তার হাতে থাকা দূরবীনটি লাল চুলের ক্যাপ্টেনের দিকে বাড়িয়ে দিল।
‘হা হা হা, জাসুপ, তুমি জানো না, ওটা হলো নৌবাহিনীর সিক্স স্টাইলসের একটি, যার নাম গেপ্পো!’
‘গেপ্পো? নৌবাহিনীর কৌশল? তবে কি ওই দ্বীপে নৌবাহিনী আছে?’
‘আমাদের পরবর্তী গন্তব্য তো ওই দ্বীপই, গিয়ে দেখলেই সব বোঝা যাবে।’
‘তা ঠিক, হা হা হা!’
জাহাজের জলদস্যুদের হাসি আর আনন্দে চারপাশ মুখরিত হয়ে উঠল।